এমবিএ শেষ করেও চাকরির পেছনে না ছুটে চ্যালেঞ্জ নিয়ে হয়েছেন উদ্যোক্তা। অনেক চড়াই উৎরায় পেরিয়ে নিজেকে উদ্ভাসিত করেছেন স্বমহিমায়। মুসলিমা আক্তার মৌ,সবাই যাকে এক নামে চেনে প্রিয়ভাষিণী মৌ বলে। নারী উদ্যোক্তা মৌ এর কাপড় আর সুঁই সুতোর প্রতিটি ফোঁড়ে লুকিয়ে আছে না বলা অযুত কথামালা।
মুসলিমা আক্তার মৌ, যশোরের মেয়ে। বাবা মায়ের সংসারে বড় হয়েছেন আর দশটা বাঙালী পরিবারের মত। মাহবুব-উল-আলম ও আবিদা সুলতানা দম্পত্তির তিন সন্তানের মধ্যে মৌ বড়। মৌ এর আছে হাবীবা আক্তার মিম ও সাইম হোসেন নামের এক বোন এক ভাই। ২০১২ সালে যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ২০১৪ সালে ডাক্তার আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন। পরবর্তীতে সরকারি এম এম কলেজ থেকে বিবিএ এবং এমবিএ সমাপ্ত করেন তিনি। শিক্ষা জীবন থেকেই নিজে কিছু করার প্রতি ছিল তার দূর্বার আকর্ষণ। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি ঘরের এক কোনে গড়ে তোলেন মৌ মাশরুম ঘর।
পড়ালেখার মধ্যে খন্ডকালীণ যুক্ত হয়েছিলেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় এডমিন এন্ড ফিন্যান্স এসিস্ট্যান্ট হিসেবে। নিজের প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে ৪৫ হাজার টাকা সঞ্চয় করেছিলেন মৌ। ঢাকায় বেড়াতে গিয়ে সেই সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে ইসলামপুর থেকে পাইকারি দরে কাপড় কিনে আনেন। ইচ্ছে ছিল পাড়া প্রতিবেশী আর পরিচিতজনের মধ্যে খুচরা দামে সেই কাপড় বিক্রি করে দিবেন। তাতে কিছু মুনাফা হবে। কিন্তু কাপড় কিনে আনার পর আশার গুড়ে বালি। নতুন উদ্যোগে তখন কেউ সাড়া দেয়নি। হতদ্দ্যেম না হয়ে মৌ নতুন উদ্যোগ নেন গজ হিসেবে কাপড় বিক্রি না করে ড্রেস বানিয়ে বিক্রি করবেন। এলাকার পরিচিত দর্জিদের দিয়ে শুরু করেন ড্রেস বানানো আর বিক্রির কাজ। প্রথমে একটু কষ্ট হলেও পরে ড্রেস বিক্রির টাকায় লাভসহ পুঁজি ফিরে আসে মৌ এর হাতে। সেই থেকে মৌ শুরু করেন কাপড় নিয়ে তার নতুন ব্যবসায়ী উদ্যোগ। সাথে যুক্ত করেন যশোরের বিখ্যাত সুঁইসুতোর কাজ যশোর স্ট্রিচ।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী একজন ভাস্কর, একজন বীরযোদ্ধা। ঝরা পাতা, মরা ডাল, গাছের গুড়ি দিয়েই মূলত তিনি গৃহের নানা শিল্পকর্ম তৈরি করতেন। ঘর এবং নিজেকে সাজানোর জন্য দামী জিনিসের পরিবর্তে সহজলভ্য জিনিস দিয়ে কিভাবে সাজানো যায় তার সন্ধান করা থেকেই তাঁর শিল্পচর্চার শুরু। স্বল্প আয়ের মানুষেরা কিভাবে অল্প খরচে সুন্দরভাবে ঘর সাজাতে পারে সে বিষয়গুলো তিনি দেখিয়েছেন। স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত সংশপ্তক এই মহিয়সী নারীর শিল্পকর্ম আর তাঁর প্রতি ভালবাসা থেকে পথচলা শুরু মুসলিমা আক্তার মৌ এর। তার প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন প্রিয়ভাষিণী নামে। এই নামই এখন তাকে এনে দিয়েছে খ্যাতি।
উদ্যোক্তা হবার নিরন্তর প্রচেষ্টা হিসেবে মৌ সম্পন্ন করেছেন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ। নিজে হয়েছেন এনএসডিএর এনলিস্টেড ট্রেইনার ও এসেসর। ব্যবসার পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরীতে মৌ কাজ নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। ব্লক, বাটিক, কাটিং, সেলাই সহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন মৌ। একা একা শুরু করা মৌ এর সাথে এখন কাজ করছেন অনেকেই। কারখানা, শো রুম আর মাঠ পর্যায় মিলিয়ে মৌ এর কর্মী সংখ্যা শ’দুয়েক।

যশোর শহরের সাদেক দারোগায় মোড়ে আছে তার কারখানা। যেখানে কাজ করেন ছয়জন নারী। চুক্তি ভিত্তিক মাঠ পর্যায়ে মৌ এর সাথে কাজ করছেন দেড় শতাধিক নারীকর্মী। আর যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বীরমুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মণি সড়কে ছিল মৌ এর প্রিয়ভাষিণী শো রুম। ছিল বলতে হচ্ছে এ কারণে বর্তমানে শো রুম আর এখানে নেই। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে শোরুমটি বেহাত হয়ে যায়। তবে ভেঙ্গে পড়েন নি মৌ। নতুন করে পৌরপার্ক সংলগ্ন স্টেডিয়াম সড়কে তৈরী করছেন প্রিয়ভাষিণীর নতুন শো রুম। শুরুতে অনলাইনে প্রচারণা ও বেচাবিক্রি হলেও এখন ডিজিটাল ও ফিজিক্যাল দুটোতেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন মৌ।

যশোর থেকে শুরু করলেও যশোরের গন্ডিতে থেমে নেই মৌ। জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নানা আয়োজনে অংশ নিচ্ছে মৌ এর প্রিয়ভাষিণী। সম্প্রতি রাজধানীতে এসএমই মেলায় মৌ এর স্টলে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তনয়া জাইমা রহমান। মৌ এর তৈরীকৃত পণ্য আর তার সংগ্রামের গল্পে অভিভূত হন জায়মা রহমান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার আয়োজনে অংশ নিয়ে প্রশংসিত হয়েছে মৌ এর প্রিয়ভাষিণী উদ্যোগটি।

প্রিয়ভাষিণীর বিষয়ে স্বত্ত্বাধিকারী মুসলিমা আক্তার মৌ বলেন, উদ্যোক্তা হতে হলে ঝুঁকি নিতে হয়। যেখানে পুরুষ উদ্যোক্তার চাইতে নারী উদ্যোক্তাদের ঝুঁকিটা আরো বেশি। পরিবারের সহায়তা না পেলে নারীদের উদ্যোক্তা হবার বাসনা অংকুরেই বিনষ্ট হতে পারে। মানুষের জন্য কিছু করবো সেই ভাবনা থেকেই যাত্রাটা শুরু করেছিলাম। সাংস্কৃতিক কর্মী ছিলাম, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ছিল। তবু তিল তিল করে উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে এসেছি। নারী বলেই আমার শোরুমটি চুক্তির মেয়াদ থাকা সত্বেও বেদখল হয়েছে। শত বাঁধা ডিঙিয়েও কাজ করে যাচ্ছি। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রিয়ভাষিণী প্রতিনিধিত্ব করবে এটা আমার স্বপ্ন।
মুসলিমা আক্তার মৌ এর মত নারী উদ্যোক্তাদের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থান। প্রতিনিয়ত নারীদের অন্তর্ভূক্তি বাড়ছে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে। যাদের হাত ধরেই বদলে যাচ্ছে লাল সবুজের প্রিয় বাংলাদেশ।