• বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন

গ্রামে বসে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নীরার

এস এম আরিফ, ফরিদপুর থেকে ফিরে / ২৪৭ বার দেখা হয়েছে
সর্বশেষ : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

ফরিদপুরের সদর উপজেলার অম্বিকাপুর। নামটি মুখে নিলেই মনের আরশীতে ভেসে ওঠে পল্লীকবির অবয়ব। কুমার নদের পাড়ে একটি ডালিম গাছের তলে চিরনিদ্রায় শায়িত পল্লীকবি জসিম উদ্দীন। কবির স্মৃতি বিজড়িত অম্বিকাপুর পল্লীর মেয়ে রোকসানা পারভীন নীরা। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে গোটা  দেশে। অম্বিকাপুর থেকে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা হিসেবে। তবে ডিজিটাল সেন্টারের বৃত্তে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি নীরা। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর নিজ প্রচেষ্টায় বৃত্তের বাইরে এসে  গড়ে তুলেছেন বিউটি পার্লার, ডিজিটাল মহিলা উন্নয়ন সমিতি, মিনি গার্মেন্টস ও স্বাস্থ্য নিরাময় কেন্দ্র নামের  ফিজিও থেরাপী ও ডায়গনস্টিক সেন্টার। এক সময় যার নিজের ভবিষ্যত নিয়ে ঘোর অমানিশায় থাকতো পরিবার, এখন সেই নীরা আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছেন ২১টি পরিবারের।

অম্বিকাপুর ইউনিয়নের কোমরপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সেনা সার্জেন্ট রইস উদ্দীন জোয়াদ্দার ও হাসনা হেনা বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় নীরা। বড়বোন রোমানা পারভীন আর ছোট ভাই হাসিবুল ইসলামকে নিয়ে কুমার নদের পাড়েই কেটেছে শৈশব। বুনিয়াদী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক আর শোভারামপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসির গন্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন সরকারি সারদা সুন্দীর মহিলা কলেজে। সেখান থেকে এইসএসসি পাশ করে ডিগ্রি ভর্তি হন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে। পড়ালেখার মধ্যেই ২০১০ সালে  যুক্ত হন অম্বিকাপুর ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের নারী উদ্যোক্তা হিসেবে। শুরুর দিকে এ যাত্রা মসৃণ ছিল না। পরিবারের অসম্মতিতো ছিল সাথে নিত্য কটুক্তি শুনতে হতো আশপাশের মানুষের। মেয়ে হয়ে ইউনিয়ন পরিষদে কাজ করাটা অনেকের কাছে শোভনীয় ছিল না। তবে আত্মস্পৃহায় চোয়াল শক্ত করে কাজ করে গেছেন নীরা। সেবা গ্রহণে গ্রামের নারীদের পদচারণা বাড়তে থাকে ডিজিটাল সেন্টারে। তারপর আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি নীরাকে।

সেবা গ্রহিতা নারীদের সাথে গল্পছলে নীরা জেনে নিতেন তাদের রোজদিনকার নামচা। সেই সময় থেকে তিনি স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন গ্রামীণ নারীদের জন্য কিছু করবেন। সেই ভাবনার বীজ অংকুরিত হয় ডিজিটাল মহিলা উন্নয়ন সমিতির নামে। ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মহিলা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। যার নাম্বার ৩৯৪/১৯। সংগঠন চালাতে টাকার দরকার। সেই টাকার জোগান দিতে পশ্চিম খাবাশপুরে স্থাপন করেন নীরা’স মেকওভার ও স্কীন কেয়ার সেন্টার নামের বিউটি পার্লারের। প্রতিষ্ঠানের যাত্রাশুরু আগে নিজে নিয়েছিলেন বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ।

অর্থনৈতিক ভাবে সমিতির নারী সদস্যদের স্বাবলম্বী করতে নীরা নিজ উদ্যোগে শুরু করেন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। গ্রামের নারীদের সেলাই সূচিশিল্পে আগ্রহের কারণে তিনি এই ট্রেডে প্রশিক্ষিত নারী তৈরীতে মনোনিবেশ করেন। শুরুতে এ কার্যক্রমে তিনি সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সহায়তা নিয়েছেন। বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষিত নারীদের সেলাই মেশিন দিয়ে সহায়তা করেছেন। কিন্তু কেউ কেউ উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের মেলে ধরতে পারছিলেন না। তখন নীরা দশজন নারীকে এক ছাদের তলায় এনে শুরু মিনি গামেন্টস নামের একটি উদ্যোগ। যে উদ্যোগে সেলাই মেশিনের চাকার সাথে ঘুরছে দশজন নারীর সংসারের চাকা।

স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের বোঝা কাঁধে চেপে অকুল পাথারে ছিলেন খায়রুন বিবি। সেই অভাবের খাদের কিনারা থেকে নবজীবনের দিশা দেখিয়েছিল নীরার মিনি গার্মেন্টস। এখানে কাজ করে তিনি স্বাবলম্বী। কাজ করে সেই টাকায় ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছেন। সুখের গল্প বলতে গিয়ে চোখে মুখে হাসির ঝিলিক বয়ে গেল খায়রুন বিবির।  সাগরিকা গূহ, মিনি গার্মেন্টেসের কাটিং মাস্টার। তিনি জানালেন তার দুঃস্বপ্নের জীবন থেকে সুখের জীবনে ফেরার গল্প। প্রার্থনা মন্ডল, মিনি গার্মেন্টসে কাজ শিখতে এসেছিলেন এই ভাবনা থেকে, নিজের ও বাচ্চাদের ড্রেস বানাতে যাতে অন্যের দারস্থ হতে না হয়। সেই শেখার কারণে যেমন নিজের অর্থ সাশ্রয় হয়েছে তেমনি অন্যদের ড্রেস বানিয়ে বাড়তি আয় হচ্ছে সংসারে। ফেরদৌসি আক্তার জানালেন, সংসারে বাচ্চাদের একটা আবদার মেটাতেও স্বামীর কাছে হাত পাততে হতো। এখন তিনি উল্টো স্বামীকে দিতে পারেন সংসারের উন্নতির জন্য। সুমাইয়া বেগম, তিনি এখন স্বপ্ন দেখেন নীরার মতো উদোক্তা হবার।

এখানেই থেমে নেই নীরার কর্মকান্ড।  স্বাস্থ্যসেবায় তিনি গড়ে তুলেছেন স্বাস্থ্য নিরাময় কেন্দ্র নামে একটি ফিজিও থেরাপী ও ডায়গনস্টিক সেন্টার। এখান থেকে প্রতিবন্ধীসহ স্বল্প খরচে সেবা নিচ্ছে গ্রামের মানুষ। যেখানে নীরার সাথে কাজ করছে রুমা বেগম, পলি খাতুন, দোলন খাতুন, সুমি বেগম, শান্তা ইসলামসহ  নয়জন নারী।

উদ্যোগের বিষয়ে রোকসানা পারভীন নীরা জানান, মানুষের জন্য কিছু আমার আজন্ম লালিত স্বপ্ন। সেজন্য কখনো চাকরির পেছনে ছুটিনি। নিজে কিছু করতে চেয়েছিলাম। বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে, সে সময় আমাকে সহযোগিতা করেছে গো নেটওয়ার্ক। সহকর্মীদের হাসিমুখ আমাকে নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা দেয়। তবে আমি নিজে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম আমাদের সাবেক জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া স্যারকে দেখে। তিনি শুধু জেলা প্রশাসকই ছিলেন না, ছিলেন উদ্যোক্তাদের অভিভাবক। নেতৃত্ব গুণে  নারী ক্ষমতায়নের অনন্য নজির তিনি। তাঁকে দেখে শিখেছি, নিজেকে তৈরী করেছি। এখন  আরো অনেক কিছু করার স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন বাস্তবায়নে যুক্ত হয়েছি সহচরী উদ্যোগের সাথে। সেই  স্বপ্ন আমাকে থামতে দেয় না।

মনীষী এপিজে আব্দুল কালাম এর সুর যেন অনুরণিত হয় নীরার কণ্ঠে। তিনি বলেছিলেন, তুমি ঘুমের ঘোরে যা দেখো তা স্বপ্ন নয়, স্বপ্ন তাই যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না।  ডিজিটাল সেন্টার থেকে যে স্বপ্ন যাত্রা শুরু হয়েছিল তাকে রূপ দিতে চান গ্লোবাল।  দারিদ্র্যতার বিশ্বজয়ে তাই নীরার নির্ঘুম প্রচেষ্টা নিজেকে ছাড়িয়ে  যাওয়ার, নিজের স্বপ্নকে ছড়িয়ে দেবার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও খবর...