টুবি’স কিচেন। কিচেন নাম শুনলেই চোখের সামনে চলে আসে রসুই ঘরের দৃশ্য। মহীয়সী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত তাঁর জীবদ্দশায় রান্নাঘর আর নারীদের নিয়ে লিখেছিলেন ‘নারীরা রাঁধুনি হয়ে জন্মগ্রহণ করে আর বাবুর্চি হয়ে মৃত্যুবরণ করে’। তবে সময়ের পালাবদলে এখন রসুই ঘরে কাজ করে নারীদের জীবনাসান হয়না বরং রসুই ঘরই কারো কারো এখন জীবন জীবিকা আর আয়ের উৎস্য। তাদেরই একজন জেসমিন আফরোজ। টুবি’স কিচেনের উদ্যোক্তা। রন্ধনশিল্পই তাকে এনে দিয়েছে আর্থিক স্বাবলম্বীতা, একই সাথে খ্যাতি। গৃহিনী থেকে যাকে বানিয়েছে আগামীর উদ্যোক্তা।

যশোরের ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন মোল্যা ও মরিয়ম বেগমের চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় জেসমিন আফরোজ। যশোর সরকারি এম এম কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স মাস্টার্স শেষ করেও পুরোদস্তুর চাকরীজীবী না হয়ে কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন যাতে কাজের মধ্যে বাঙালীয়ানাকে লালন করতে পারেন। রক্ষণশীল পরিবারে মেয়েদের বাইরে গিয়ে কাজ করাটা অনেকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেন না। তার বেলায়ও এর ব্যাতয় ঘটেনি। তবে দমে যাবার পাত্র ছিলেন না জেসমিন। তিনিও চেষ্টা করছিলেন ঘরে বসেই কিভাবে উপার্জন করা যায়। সেই ভাবনায় পথপ্রদর্শক হয় আগামী উদ্যোক্তা ফাউন্ডেশন। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের হোমমেড খাবারের ই-কমার্স প্লাটফর্ম আগামীর উদ্যোক্তা’র হাত ধরেই নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলেন জেসমিন আফরোজ।
বাঙালী সব মেয়েদেরই শৈশব শুরু হয় রান্নাবান্না দিয়ে। কখনো খেলার ছলে , কখনো মা’কে সহযোগিতা করতে। মায়ের কাছ থেকে শেখা রান্না দিয়েই শুরু করেন জেসমিন আফরোজ। জেসমিনের মায়ের নাম মরিয়ম বেগম। তবে নানা তার মা’কে আদর করে টুবি বলে ডাকতেন। নানা মারা যাবার পর তার মায়ের এই নামটি হারিয়ে যেতে বসেছিল। মায়ের ডাক নামটি জাগিয়ে তুলতে আর মায়ের পরম মমতায় শেখানো রান্নাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে জেসমিন তার প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন ‘ টুবি’স কিচেন’।
যে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন সেই যাত্রাটা স্বপ্নীল হয়নি। অনলাইন প্লাটফর্মে প্রচারণায় যেমন সাড়া মেলেনি তেমন অর্ডারের পরিমানও ছিল খুব কম। তবে আশাহত না হয়ে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা করেন জেসমিন। আগামীর উদ্যোক্তা প্লাটফর্ম থেকে নিয়েছিলেন ই কমার্সের প্রশিক্ষণ। সেটিকে আরো শাণিত করতে যুক্ত হন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতার অ্যাগ্রোফুড আইএসসি সেক্টরে প্রশিক্ষণে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রুরাল রিকন্সট্রাকশন ফাউন্ডেশন (আরআরএফ) থেকে সফলতার সাথে কোর্স সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে একই ট্রেডে এডভান্স লেভেলে কোর্স করেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আভা থেকে। নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির পর বদলে যায় টুবি’স কিচেনের গল্প। অনলাইন অফলাইন প্রচারণা আর খাবারের গুণমত মান ও স্বাদের কারণে সবার প্রিয় হয়ে উঠে টুবি’স কিচেন। এই কিচেনের চুই ঝাল খাসির মাংস, ছিটে রুটি দেশী মুরগীর মাংস, কালাই রুটি হাসের মাংস কিম্বা নানা স্বাদের পিঠা পায়েস যে খেয়েছে তার স্বাদ ভোলা কঠিন। দেশী বিদেশী সব ধরণের খাবার অর্ডার করলে মিলছে টুবি’স কিচেনে।

টুবি’স কিচেন টেকওয়ে রেস্টুরেন্টের আপডেট ভার্সন। অর্ডার আসলে এখানে রান্না করা হয়। খাবার কাস্টমার নিজেও নিযে যেতে পারেন অথবা অ্যাপ ভিত্তিক অনলাইন রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে অফিস বা ঘরে বসেও পেতে পারেন। টুবি’স কিচেন বেশি সরগরম থাকে মধ্যাহ্ন ভোজের রান্নায়। চিকিৎসক, ব্যাংক, বীমা বা অফিসের কর্মকরর্তাদের দুপুরের খাবার যায় এই কিচেন থেকে। সাথে সান্ধ্যকালীণ নাস্তাও। তবে আগে অর্ডার করলে সকালের নাস্তা বা কোন সভা সমাবেশ বা যে কোন আয়োজনের নাস্তা সরবরাহ করে টুবি’স কিচেন। এখানকার ঋতু ভিত্তিক আয়োজনগুলিও জনপ্রিয় । শীতকালীণ রসের পিঠা পায়েস থেকে শুরু করে বর্ষায় সর্ষে ইলিশ, খিচুড়ী কিম্বা সময় উপযোগী খাবার তৈরী টুবি’স কিচেনের নান্দনিক উদ্যোগ।
স্বামী আফজাল হোসেন ও একমাত্র মেয়ে আফসারা বিনতে আফজালকে নিয়ে সংসার জেসমিন আফরোজের। এর বাইরে নারীদেরকে আর্থিক কর্মকান্ডে যুক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। আগামীর উদ্যোক্তা প্লাটফর্মে ২০২৪ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। পরের বছর তিনি দায়িত্ব পালন করেন সহসভাপতি হিসেবে। বর্তমানে একই সংগঠনে তিনি ভোক্তা অধিকার উন্নয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ কমিটির সহ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

টুবি’স কিচেনের বিষয়ে উদ্যোক্তা জেসমিন আফরোজ বলেন, আমার উদ্যোগের সাথে মায়ের নাম জড়ানো তাই চেষ্টা করি মায়ের মমতায় খাবার তৈরী করার। শুরুটা কুসুমাস্তীর্ণ না হলেও ধীরে ধীরে টুবি’স কিচেন গুছিয়ে উঠেছে। আশা করছি হারাতে বসা পিঠাপুলি আর আমাদের ঐতিহ্যময় খাবারগুলি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ছড়িয়ে দিতে পারবো।
স্পেশাল নুডুলস তৈরী থেকে আগেই পেয়েছিলেন ‘রামেন কুইন’ খ্যাতি। আর এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বাঙালী খাবারের ব্র্যান্ড এম্বেসেডর হবে টুবি’স কিচেন এমনটাই আশা সুহৃদদের।