• শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ০২:০৩ পূর্বাহ্ন

বাঁশের মোড়ায় স্বর্ণালী স্বপ্ন

এস এম আরিফ / ৮০ বার দেখা হয়েছে
সর্বশেষ : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

স্বর্ণালী দাস। বাঁশ দিয়ে মোড়া তৈরী করেন। নিজের বাড়ির এক চিলতে উঠোনই তার কারখানা। গৃহস্থালীর পাশাপাশি শিল্পকর্ম দিয়ে হাল ধরেছেন সংসারের। স্বচ্ছলতার সাথে তৈরী করেছেন অন্যদেরও কর্মসংস্থান। এখন তার হাতের তৈরী মোড়া যাচ্ছে দেশের সীমানা পেরিয়ে দেশের বাইরেও। তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত না ঘুরে যদি সরাসরি নিজেরা পাঠাতে পারতেন তখন আয়ের সাথে মিলতো কারিগরের স্বীকৃতি।

স্বর্ণালী দাসের শুরুর গল্পটা স্বর্ণালী ছিল না মোটেও। নানা প্রতিকূলতাকে পায়ে মাড়িয়ে তবে সৃষ্টি হয়েছে আজকের অবস্থান।খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়নের নোয়াকাটি গ্রামের মেয়ে স্বর্ণালী। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভদ্রা নদীর মতই ছিল জীবনের জোয়ারভাটা। পল্লী গাঁয়ে সুশ্রী কন্যার মতো বালাই দ্বিতীয়টি নেই। তাই পেড়াশোনার অদম্য ইচ্ছে থাকলেও পরিবারের মত মেনে বসতে হয়েছিল বিয়ের পিঁড়িতে। বউ হয়ে আসেন যশোরের মণিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের চিনাটোলা গ্রামের দাসপাড়ায়। যে পাড়ার পরিচিতি বাঁশের তৈরী মোড়ার জন্য।পাড়াপতি গণেশ দাস আর গীতা রানী দাসের ছোট ছেলে সন্যাসী দাসের বধূ হিসেবে সংসারে যুক্ত হন স্বর্ণালী। লেখাপড়া জানা থাকার পরও অন্য কিছু করার চেষ্টা না করে বংশ পরম্পরায় চলে আসা শিল্পকর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেন স্বর্ণালী। শাশুড়ী গীতা রানীর কাছেই তার হাতে খড়ি। প্রথমে শিব গড়তে বাদর গড়ার মত হয়েছে তবে এখন নিপুণ হাতে তিনি তৈরী করতে পারেন বাঁশের মোড়া। চিনাটোলা গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া হরিহর নদীর তীরঘেঁষা এই পল্লীর উনসত্তর পরিবারে প্রায় হাজার খানেক মানুষের জীবন-জীবিকার মূল উৎস হলো মোড়া বানানো। পূর্বপুরুষের আদি এ পেশা আঁকড়ে ধরেই চলছে তাদের জীবনপঞ্জি।

স্বর্ণালী দাস জানান একটা মোড়া বানাতে কয়েকটি ধাপ পার করতে হয়। বাঁশ কাটা দিয়ে কাজের শুরু। এরপর বাঁশ পরিমাপ মতো সাইজ করে কাটা হয়। সেই কাটা অংশ থেকে বেতি তোলা হয়। বেতি রোদে শুকানো হয়, রং করা হয়। তারপর মূলকাজ মোড়া বানানো। বেতি বোনার পর মাঝ বরাবর শক্ত বাঁধন দেয়া হয়। এরপর উপর নীচে সাইকেলের পুরাতন টায়ার দিয়ে মোড়ানো হয়। রঙিন ফিতা দিয়ে মুড়িয়ে তৈরী করা হয় মোড়া। ছোট মাঝারী বড় বিভিন্ন সাইজের মোড়া তৈরী করেন তারা। খুচরা জোড়া অথবা পাইকারী ২৫টায় এক বান্ডিল হিসেবে বিক্রি করেন তারা। দিনশেষে প্রতিটি মোড়ায় খরচ বাদ দিয়ে ১৫০/২০০ টাকা থাকে বলে জানান স্বর্ণালী। একজন কর্মী চাইলে দিনে কমপক্ষে চারটি মোড়া তৈরী করতে পারেন।

সৃষ্টি সুখের উল্লাসের সাথে হতাশাও ঝরলো স্বর্ণালীর কণ্ঠে। প্লাস্টিকের বহুল ব্যবহারে  এ শিল্প মার খেয়ে যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ক্ষুদ্র এ কুটির শিল্পে তৈরি মোড়া বিদেশে রফতানি করে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। মোড়া বানানোর মূল উপকরণ বাঁশ। বাঁশ বাজার থেকে কিনতে হয়।  বাঁশসহ মোড়া তৈরির উপকরণের দাম বেড়েই চলেছে। সেই তুলনায় মোড়ার দাম বাড়েনি। আবার কম দামে প্লাস্টিকের চেয়ার, টুল বাজারে পাওয়া যাওয়ায় দাম দিয়ে বাঁশের মোড়া কিনতে অনেকে অনাগ্রহী হচ্ছে। পাশাপাশি তারা চান সহজ শর্তে পূঁজির যোগান। অর্থের প্রয়োজনে ছুটতে হয় মহাজন বা এনজিওর দ্বারে। গলাকাটা সুদে নিতে হয় অর্থ সহায়তা। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার আকুতি স্বর্ণালীর মত নিভৃত পল্লীর শিল্পকর্মীদের।

এই শিল্পটি যতটা তাদের পেশা তার চাইতে আরো বেশি আবেগ। হুমকির মুখে পড়লেও পূর্ব পুরুষের এই পেশা তারা ছাড়তে চান না। বরং স্বর্ণালী দাস স্বপ্ন দেখেন এখন তাদের তৈরিকৃত মোড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বাংলাবান্দা, পঞ্চগড়, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কখনওবা মণিরামপুর থেকেও তারা পাইকারদের কাছে পণ্য পাঠিয়ে দেন। পাইকাররা তাদের তৈরী এ পণ্য বিদেশেও পাঠাচ্ছেন। স্বর্ণালী দাস নিজে বাঁশের মোড়া বিদেশে পাঠাতে চান। বিদেশের বাজারে শুধু মোড়া হিসেবে নয় বিক্রি হবে মেইড ইন বাংলাদেশ হিসেবে যাতে কারিগর হিসেবে লেখা থাকবে স্বর্ণালী দাস বা তার মত নারী শিল্পকর্মীর নাম।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও খবর...